স্কুলের শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিনের মতোই চলছে পাঠদান। শিক্ষক পড়াচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। সবাই আছে, শুধু নেই ফাতেমা আক্তার সিফা (৯)। তার খালি বেঞ্চটি যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে এক হৃদয়বিদারক শূন্যতার কথা। নিহত সিফা লক্ষ্মীপুরের রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার আমীর মাস্টারের বাসায় মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে মা শাহীনুর বেগম (৩৮) ও দুই বোন সায়মা আক্তার (২০), ইকরা আক্তার (১৭)-এর সঙ্গে প্রাণ হারায় সিফাও।
ঘটনার দিন বড় বোন সায়মা ঢাকা থেকে বেড়াতে আসায় সেদিন স্কুলে যায়নি সিফা। সহপাঠী ও শিক্ষকদের অনেকেরই বিশ্বাস, সেদিন ক্লাসে এলে হয়তো সে বেঁচে যেত।
সিফার সহপাঠী সাকাল জানায়, “সিফা আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। বুধবার ক্লাসে আমাদের শেষ কথা হয়। সে বলেছিল, বৃহস্পতিবার আমার বাসায় আসবে। আমি বলেছিলাম, শুক্রবার আসতে, সেদিন তাকে সময় দেব। কিন্তু এরপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। ওই দিনই ছিল আমাদের শেষ কথা।”
আরেক সহপাঠী হাসিব বলে, “সিফার জন্য আমরা সবাই কষ্ট পেয়েছি। আমরা তার ও তার পরিবারের হত্যার বিচার চাই। একই সঙ্গে এই ঘটনার রহস্যও উদ্ঘাটন হোক।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরে আলম মাহমুদ বলেন, “সিফা ও তার পরিবারের জন্য বিদ্যালয়ে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সিফার বড় দুই বোন এবং বর্তমানে জীবিত থাকা ভাই সিফাতও একসময় এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “নিয়মিত উপস্থিত থাকা সিফার নাম আজ হাজিরা খাতায় চিরদিনের জন্য অনুপস্থিতির তালিকায়। সহপাঠীদের হাসি-আড্ডার মাঝেও তার খালি আসন বারবার মনে করিয়ে দেয় এক অপূরণীয় ক্ষতির কথা।”
স্থানীয়রা জানান, শাহীনুর বেগমের তিন মেয়েই মেধাবী ও নম্র স্বভাবের ছিল। পরিবারের সঙ্গে এলাকাবাসীর সুসম্পর্ক ছিল। তাই এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকাকেই শোকাহত করেছে।
নিহত পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য জুনায়েদুল ইসলাম সিফাত সুষ্ঠু বিচার দাবি করে বলেন, “ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি যদি অন্য কেউ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাদেরও দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের রমজান মাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাবা কামালকে হারায় সিফাত। আর ২০২৬ সালে হারিয়েছে মা ও তিন বোনকে। একের পর এক স্বজন হারানোর এই বেদনাময় অধ্যায় শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো রায়পুরবাসীকেই গভীর শোকে আচ্ছন্ন করেছে।