“কত আশা ছিলো, ছেলেকে ডাক্তার বানাবো। তাই তো তাকে একটি দামি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। সেই স্কুলই আজ আমার কলিজার টুকরার প্রাণ কেড়ে নিলো! আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো? কে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলবে— ‘আম্মু, আমি তোমাকে বিদেশে নিয়ে যাবো, তোমার জন্য সুন্দর জামা কিনবো?’ আহারে!”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথাগুলো বলছিলেন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার উদয়পুরে অবস্থিত ফরিদ আহমদ ভূঁইয়া একাডেমির আবাসিক হলে সিনিয়র ছাত্রদের নির্যাতনে নিহত অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের মা শারমিন আক্তার।
ঘটনার ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য আসামিপক্ষ বিভিন্নভাবে চাপ ও তদবির করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শোকাহত মা শারমিন আক্তার বিলাপ করে বলেন, “আমার বাবা অন্ধকারে খুব ভয় পেতো। এখন সে কবরে কিভাবে থাকে? সেখানে তো কোনো আলো নেই! কত কষ্ট দিয়ে আমার ছেলেটাকে মেরে ফেললো!”
এসময় মেহেদীর বাবা জিয়াউদ্দিন ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, “একটা আইফোনের জন্য আমার ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেললো! আমাকে একবার জানালেই আমি নিজেই আইফোন কিনে দিতাম। ওরা কেন আমার ছেলেকে এভাবে মারলো?”
পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরাও এই ঘটনায় গভীর শোকাহত। মেহেদীর নানি জানান, সান্ত্বনা দিতে কেউ এলে বাবা-মায়ের শোক আরও বেড়ে যায়। পুরো পরিবার এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।
জানা যায়, গত মঙ্গলবার আবাসিক হলের এক শিক্ষার্থীর আইফোন চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেহেদী হাসানকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে কয়েকজন সিনিয়র ছাত্র তাকে হলের ভেতরে ডেকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানবিক নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে মেহেদী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে স্থানীয় জনতা। ওই রাতেই তারা স্কুল ক্যাম্পাসে গিয়ে ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং তদন্তের স্বার্থে বিদ্যালয়টি এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে মেহেদীর বাবা জিয়াউদ্দিন বাদী হয়ে প্রধান শিক্ষকসহ ১৮ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। প্রধান শিক্ষক আ. মান্নানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন নির্মম ঘটনা আর না ঘটে।