ভরা মৌসুম শুরু হলেও লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ মিলছে না। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ এবং ডুবোচর বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক পরিযায়ন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে আগস্টের শেষ দিকে বৃষ্টিপাত বাড়লে নদীতে ইলিশের সরবরাহও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর মোহনাগুলোতে পলি জমে অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। এতে সমুদ্র থেকে মিঠাপানির নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদীর পানির লবণাক্ততা ও স্রোতের গতিতেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে ডিম ছাড়ার উপযোগী পরিবেশ না পেয়ে মা ইলিশ গভীর সমুদ্রেই অবস্থান করছে।
এ ছাড়া নদীতে শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণের কারণে ইলিশের আবাসস্থল ও খাদ্যচক্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে নির্বিচারে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার ফলে প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে এলে এবং বৃষ্টিপাত বাড়লে নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে। তখন সমুদ্র থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ আবার নদীতে ফিরে আসবে।
রায়পুরের চরবংশী ও মজুচৌধুরীর ঘাট এলাকার জেলেদের ভাষ্য, নদী ও সাগরে প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য এবং কীটনাশক ফেলার কারণে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। উপকূলীয় নদীতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশও মা ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাটকা ও মা ইলিশ ধরার কারণে প্রতিবছরই ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
মাছ কম ধরা পড়ায় হতাশ জেলে, আড়তদার ও ক্রেতারা। সরবরাহ কম থাকায় মাছ ধরার খরচ বেড়েছে, আর তার প্রভাব পড়েছে বাজারদরেও। যদিও মৌসুম শুরুর তুলনায় গত দুই সপ্তাহে প্রতি কেজি ইলিশের দাম গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কমেছে, তবুও এক কেজি ওজনের ইলিশ এখনও ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ায় তা অনেক সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে।
রায়পুরের চরবংশীর নাইয়াপাড়া এলাকার জেলে মো. মিলন মাঝি বলেন, “মাছ কম ধরা পড়ায় অনেক জেলে নদীতে কম যাচ্ছেন। চারজন জেলে সারারাত নদীতে থেকে মাত্র ৪ হাজার ৮০০ টাকার মাছ পেয়েছি। জ্বালানি, খাবার ও নৌকার মালিকের অংশ বাদ দিলে জনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা থাকে।”
একই এলাকার জেলে মানিক বলেন, “এখনও নদীতে পর্যাপ্ত পানি নেই। কিছুদিন পর পানি বাড়লে জালে মাছ ধরা পড়বে বলে আশা করছি।”
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সন্ধ্যায় রায়পুরের নতুনবাজার ঘুরে দেখা যায়, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়।
মাছ বিক্রেতা মো. হোসেন বলেন, “এই সময়ে ইলিশের বেচাকেনায় বাজার সরগরম থাকার কথা। কিন্তু এখন মাছও কম, ক্রেতাও কম।”
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা বেপারি বলেন, “সদরের মজুচৌধুরী ঘাট এবং রায়পুরের চান্দারখাল, হাজিমারা সুইজগেট ও সাজু মোল্লার মাছঘাটে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মণ ইলিশ আসছে। বাজারের চাহিদার তুলনায় এটি খুবই কম। ফলে আড়তগুলো প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। সরবরাহ বাড়লে দামও কমে আসবে।”
লক্ষ্মীপুর জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, “এবার বৃষ্টিপাত খুবই কম হয়েছে। সেই সঙ্গে নদীদূষণ ও ডুবোচর বেড়ে যাওয়ায় রায়পুর, সদর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় ইলিশের সরবরাহ কমেছে। আগস্টের শেষ দিকে নদীতে পানি বাড়লে ইলিশের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করছি।”