তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। বিশেষ করে নতুন বাজার–মহিলা কলেজ সড়ক এবং ট্রাফিক মোড় থেকে হায়দরগঞ্জ সড়কের নর্দমা পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। কোথাও ড্রেনের মাঝখানেই বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখে নির্মাণকাজ চলছে, আবার কোথাও খোলা গর্ত ও ভাঙা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রায়পুর প্রথম শ্রেণির পৌরসভার বেশ কয়েকটি সড়কে এখনও উন্নয়নকাজ চলমান। কিছু সড়ক আংশিক, আবার কিছু পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কোথাও খননযন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করা হলেও পিচঢালাই করা হয়নি। ফলে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৩ সালের মার্চে পৌরসভার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখনও শেষ হয়নি। দীর্ঘসূত্রতার কারণে সড়কের দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এ এলাকায় বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, সরকারি অফিস, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব সড়ক ব্যবহার করেন। রায়পুর মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাকিল বলেন, সড়কে বড় বড় গর্ত ও ভাঙা অংশ থাকায় যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। মোটরসাইকেল চালকরা শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন, রিকশাচালকেরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন চরম ভোগান্তির মধ্যে কলেজে যাতায়াত করছে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ট্রাফিক মোড় থেকে হায়দরগঞ্জ সড়কের মডেল মসজিদ পর্যন্ত এবং মধুপুর এলাকার বিভিন্ন সড়কে বড় বড় গর্ত ও কাদার সৃষ্টি হয়েছে। মহিলা কলেজ সড়ক পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বিকল্প পথে ঘুরে যেতে হচ্ছে মানুষকে। এতে সময় ও ভোগান্তি—দুটিই বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। শিক্ষার্থীদের অনেক দূর হেঁটে চলাচল করতে হয়। মসজিদ, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ‘পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদনের পর শহরকে ছয়টি ক্যাচমেন্টে ভাগ করে উন্নয়নকাজ শুরু হয়। এর আওতায় নতুন বাজার–মহিলা কলেজ, পোস্ট অফিস সড়ক, টিএনটি সড়ক, মধুপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন ও সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিম ও বিল্লাল হোসেন বলেন, মহিলা কলেজ ও মধুপুর এলাকায় বড় বড় গর্তের কারণে প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। পিচঢালাই না থাকায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক ও রিকশাচালকেরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। রায়পুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুন্নবী জানান, IUGIP প্রকল্পের আওতায় নতুন বাজার থেকে মহিলা কলেজ পর্যন্ত তিনটি প্যাকেজে প্রায় ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ট্রাফিক মোড় থেকে নর্দমা পর্যন্ত ড্রেন ও সড়ক নির্মাণে ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নতুন বাজার–মহিলা কলেজ অংশের কাজের দায়িত্ব পাওয়া মেসার্স রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও প্রতিষ্ঠানটি আংশিক কাজ করে প্রায় ৩ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে। এরপর থেকে কাজ প্রায় বন্ধ থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। খোলা ড্রেনে পড়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীরা। এ ছাড়া থানার মোড় থেকে নর্দমা পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস-এর বিরুদ্ধেও ধীরগতিতে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষ একাধিকবার তাগিদ দিলেও কাজের গতি বাড়েনি। অনেক স্থানে নিরাপত্তা ব্যারিকেড বা সতর্কীকরণ চিহ্ন না থাকায় রাত ও বর্ষাকালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। উপসহকারী প্রকৌশলী আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে কয়েকটি সড়কে একযোগে কাজ চলায় আপাতত বড় ধরনের সংস্কার সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রকল্প শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্ত সব সড়কে পিচঢালাই করা হবে। রায়পুর পৌরসভার প্রশাসক (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ট্রাফিক মোড় থেকে নর্দমা পর্যন্ত সড়কে আপাতত ইটের কংকর দিয়ে ঢালাই করা হচ্ছে। বর্ষার কারণে কয়েকটি কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বর্ষা শেষ হলেই নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে এবং যেসব সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পিচঢালাই করে চলাচল উপযোগী করা হবে।