প্রায় ছয় বছর আগে, ২০২০ সালের ১৯ জুলাই লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নের লুধুয়া গ্রামে ফাতেমা আক্তার (২০) নামের এক তরুণীকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয় বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর পরও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এর মধ্যে আটবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নিহত ফাতেমা ওই গ্রামের কৃষক মৃত সিরাজুল ইসলামের মেয়ে। ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে একাই ছিলেন। তাঁর মা হাসনা বেগম ও বোন ঢাকায় চিকিৎসার কাজে ছিলেন। পরিবারের দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রতিবেশীরা ফাতেমাকে হত্যা করেছেন। মেয়েকে হারানোর পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ফাতেমার মা হাসনা বেগম। আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই তাঁর। বেশির ভাগ সময় চুপচাপ ও অন্যমনস্ক থাকেন। ছয় বছর ধরে মেয়েকে হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। হাসনা বেগম বলেন, ‘বিচার তো দূরের কথা, ছয় বছরেও মেয়েকে কে, কেন হত্যা করল—সেই রহস্যই বের হলো না। এই অবস্থায় কীভাবে বিচারের আশা করি? তবু মা তো, আশা ছাড়তে পারি না। আশা করি, খুব শিগগির ফাতেমা হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হবে, খুনি ধরা পড়বে এবং মেয়ের হত্যার বিচার পাব।’ মামলার বাদী ও ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বলেন, ‘আটবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার তো দূরের কথা, ছয় বছরেও মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি কেউ।’ তিনি বলেন, ‘এক কর্মকর্তা বলেন তদন্ত শেষ পর্যায়ে, আবার নতুন কর্মকর্তা এসে নতুন করে তদন্তের কথা বলেন। ছয় বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’ যেভাবে শুরু হয় মামলা পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৯ জুলাই রায়পুরে নিজ বাড়ি থেকে ফাতেমা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচারিত হয়। পরিবারের দাবি, হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করেছিলেন। এ ঘটনায় তখন রায়পুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট প্রতিবেদনটি রায়পুর থানায় পাঠানো হয়। এতে ফাতেমার মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। এর ভিত্তিতে ওই বছরের ২৯ আগস্ট ফাতেমার বোন সারাবান তহুরা বাদী হয়ে রায়পুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক বিরোধের জেরে ফাতেমাকে তাঁর নিজ কক্ষে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ঘটনায় একই বাড়ির রায়হান, রাইমা বেগম, শারমিন আক্তার ও মো. ইয়াসিনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পুলিশ প্রধান আসামি রায়হানকে গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। এরপর মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ডিবির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয় ডিবির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাতেমাকে মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হলেও তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী, নির্ভরযোগ্য বা পরোক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। অন্য কোনো ব্যক্তি ফাতেমাকে হত্যা করেছেন—এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তদন্তে পাওয়া যায়নি। ফলে ভবিষ্যতে মামলায় কোনো সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হয়ে ২০২২ সালের ৫ মে মামলার বাদী সারাবান তহুরা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন। শুনানি শেষে আদালত ডিবির তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। এরপর মামলাটি সিআইডির হাতে যায়। কিন্তু সিআইডির তদন্তেও ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। ডিবির তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমি বর্তমানে অবসরে আছি। ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত না করার অভিযোগ সঠিক নয়। যতটুকু মনে পড়ে, তদন্তের সময় যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি, সেগুলোর ভিত্তিতেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছি।’ বদলেছেন একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিআইডিতে মামলাটি যাওয়ার পর এ পর্যন্ত পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। এর আগে পুলিশ ও সিআইডি মিলিয়ে আরও তিনজন কর্মকর্তা পরিবর্তন হন। একেক সময় একেক কর্মকর্তা মামলার দায়িত্ব নিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মামলার তদন্তের অগ্রগতিও যেন নতুন করে শুরু হয়েছে। কখনো সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আবার কখনো বলা হয়েছে, নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বলা হচ্ছে, কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তবে ছয় বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যরা এখন আর এসব আশ্বাসে ভরসা করতে পারছেন না। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটি আমি গত ছয় মাস ধরে তদন্ত করছি। নানান দিক থেকে ক্লু (সূত্র) পাওয়ার চেষ্টা করছি। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’ মামলার ছয় নম্বর সাক্ষী রেহানুজ্জামান রনি ভূঁইয়া বলেন, ডিবির তদন্তের সময় তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে যথাযথভাবে তদন্ত করেননি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ফাতেমাকে মাথায় আঘাত ও শ্বাস রোধ করে হত্যার কথা উল্লেখ থাকলেও হত্যাকারী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে হত্যার কথা বলা হয়েছে। হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব ছিল তদন্ত কর্মকর্তার। অথচ তদন্ত না করেই মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক তদবিরের কারণে এমন করা হয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস।’ তবে মামলার প্রধান আসামি মো. রায়হান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফাতেমা আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরে আমাদের অন্যায়ভাবে এ মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’ ছয় বছর আগে একটি মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার কথা বলা হলেও হত্যাকারী শনাক্ত হয়নি; তদন্ত কর্মকর্তা বদলেছেন একের পর এক। এখন পরিবারের অপেক্ষা—সিআইডির তদন্তে কি অবশেষে ফাতেমা হত্যার রহস্যের জট খুলবে এবং আদালতে পৌঁছাবে তদন্তের ফল?