লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে কবিরাজি চিকিৎসার আড়ালে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বৈধ অনুমোদন ছাড়াই হাড় ভাঙার চিকিৎসার নামে অসহায় মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের অপচিকিৎসার কারণে অনেক রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছেন। সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগীর টাকা আত্মসাৎ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। কয়েক দিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে কথিত কবিরাজের গোপন চিকিৎসাকেন্দ্র এবং তার পেছনে থাকা প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার (২৪ জুন) ভণ্ড কবিরাজ বাহারের বিচার ও অর্থ ফেরতের দাবিতে উপজেলার উত্তর চরআবাবিল গ্রামের মৃত শহীদ উল্লাহ বকাউলের মেয়ে ফাহিমা বেগম রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের সূত্র ধরে রায়পুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বলাছ এলাকায় কথিত কবিরাজ বাহার হোসেনের বাড়িতে সরেজমিনে যান এই প্রতিবেদকসহ কয়েকজন সাংবাদিক। সেখানে বাড়ির ভেতরে একটি নির্জন স্থানে চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো পরিবেশ দেখতে পাওয়া যায়। বাইরে থেকে সাধারণ টিনশেড ঘর মনে হলেও ভেতরে একাধিক বেড পেতে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার কাটার পর ফেলে দেওয়া আবর্জনার স্তূপও দেখা যায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাহার হোসেন দাবি করেন, তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ পদ্ধতিতে হাড় ভাঙার চিকিৎসা করে থাকেন। তবে এ বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত অনুমোদনের তথ্য তিনি দেখাতে পারেননি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মহল ‘ম্যানেজ’ করার দাপট দেখিয়ে তিনি অবৈধভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। কবিরাজ বাহারের অপচিকিৎসার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন উত্তর চরআবাবিল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফাহিমা বেগম। তিনি জানান, তাঁর বৃদ্ধ বাবা ও খালার পা ভাঙার চিকিৎসার জন্য বাহারের কাছে যান। চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার আশ্বাস দিয়ে বাহার তাদের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নেন। চুক্তি ছিল, রোগী সুস্থ না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। ফাহিমার অভিযোগ, বাহারের দেওয়া অজ্ঞাত রাসায়নিক মিশ্রিত ওষুধ ও মালিশ ব্যবহারের পর রোগীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং ব্যথা আরও বেড়ে যায় এবং জটিলতা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী টাকা ফেরত চাইলে বাহার ও তার সহযোগীরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম বলেন, “ফাহিমা নামের এক নারী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা এবং প্রতারণা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, “চিকিৎসার নামে যারা অপচিকিৎসা ও প্রতারণা করছে, তারা সমাজের জন্য হুমকি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল কথিত কবিরাজ বাহার হোসেন এবং তার আশ্রয়দাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ ধরনের প্রতারণামূলক চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।